রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন

“এসডিজি অর্জনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের উন্নয়নের বিকল্প নেই”

admin
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২০
  • ৩৯৩ বার পঠিত

কালিদাস রায় ॥
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাকা ইউনিয়নের চক মাহাপুর গ্রামে ৪টি পরিবারের ২০ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী(আদিবাসী) সম্প্র্রদায়ের লোকজন বসবাস। প্রায় ৩০ বছর ধরে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলের জায়গায় বাস করেন উরাও সম্প্রদায়ের এই পিছিয়ে পড়া লোকজন। এখানে বসবাস শুরু করার আগে মিল কর্তৃপক্ষের সাথে বিশেষ চুক্তিতে সম্মত হয়েই তারা এখানে বসবাস আরম্ভ করেন। সারা বছর মিলের নির্ধারিত কাজ গুলোই তারা করে আসছেন। অন্যত্র কাজ করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু আক্ষরিক মিল কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কোন মহল এদের জীবনমান উন্নয়নে এগিয়ে আসেননি। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন থেকে কোন সুবিধাদি তারা পান না। ৪টির পরিবারের লোকজনের জন্য নেই কোন স্বাস্থ্যসম্মত টিউব ও পায়খানা।
এখানকার বাসিন্দারা এখনও বাইরে গিয়ে মলমুত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আর্থিক অভাব অনটনে সংসারের ঘানি টানাই যখন যুদ্ধজয়ের মত অবস্থা তখন বিলাসিতা তাদের কাছে হাস্যকর বটে। চেহারার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, খেয়ে না খেয়ে কোন রকমে দিন কাটান তারা।
এই চিত্র শুধু চক মাহাপুর গ্রামেরই নয়, জেলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী(আদবাসী) অধ্যুষিত স্থানে কম বেশি একই রকমের চিত্র দেখতে পাওয়া যায়।
ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরের জনপদ নাটোর জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি লোকজন। জেলায় উরাও, সাওতাল, মুন্ডা, গঞ্জু, কোল, পাহাড়ী, মাহাতো, কোচ, বাগদী, মুসহর, লোহার, মাহালি, গারো, রবিদাস সহ বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস। এই সব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনের সংগ্রামের পরতে পরতে শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ নানা সমস্যার গল্প মিশে আছে।
এসডিজি অর্জনে বর্তমান সরকার নানা উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আর তাই সার্বিক উন্নয়ন তরান্বিত করতে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলোকে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে যা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই সব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলো মূলধারার সাথে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারবে? যদি নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার হিসেব করা যায়, তবে কি এই সব পিছিয়ে পড়াদের প্রকৃত অবস্থা নিরুপন করতে সরকারি কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? উন্নয়ন লক্ষমাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারার মত কতখানি সক্ষমতা তারা অর্জন করতে পেরেছে সেটাও বিবেচনায় আনা উচিত। চলতি অর্থবছরে পাহাড়ী অঞ্চলের জন্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্ধ দেওয়া হয় সেখানে সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য মাত্র প্রায় ৫০ কোটি। পাহাড়ীরের চাইতে সমতলে এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যটা অনেক বেশি। সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে এই বাজেট বৈষম্য দূরীকরণে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে যেসকল সুবিধা দেওয়া হচ্ছে সেটাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এছাড়া শিক্ষা, ভাষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক ব্যবস্থা সব কিছুতেই এরা পিছিয়ে রয়েছে। এদের উত্তরণে এখনও পর্যন্ত প্রায়োগিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া হয়নি কারোরই।
সরেজমিনে নাটোর জেলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে গিয়ে যে বাস্তবচিত্র চোখে পড়ে তা হলো সত্যিকার অর্থেই এদের জীবনমান এখনও অনেক অনুন্নত, অমানবিক। দেশ স্বাধীনের পর অদ্যবধি এই জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগোষ্ঠী থেকে উল্লেখযোগ্য বড় কোন পজিশনে আসতে পারেননি। কৃষিকাজ নির্ভর এই মানুষগুলো বর্তমানে সারাবছর কৃষি কাজের উপর নির্ভর করতে পারেনা। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় অন্য পেশায় তাদেকে তেমন একটা দেখাও যায় না। কর্মসংস্থানের অভাবে এই ভ’মিহীন, অভাবী মানুষগুলো তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন না। ফলে সমাগুলোতে সরকারি চাকুরীজীবদের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। এসএসসি কিংবা এইচএসসি পাশ করার পরে ঝড়ে পড়া এই মেধাবীদের অর্থ উপার্জনের উৎস হয় গার্মেন্টস, ইটভাটা, কৃষি জমি, কিংবা মজুরী বিক্রি। সরকারি চাকুরিতে কোটার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অতি সম্প্রতি দেশব্যাপী মাদক নির্মূল অভিযানের কারনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গ্রামগুলোতে সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা অনেকাংশে কমে এসেছে। কমে এসেছে মাদকসেবীর সংখ্যা। জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ অন্যান্য সংগঠনের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি অর্জনের যে আন্দোলন তা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হয়নি নানা কারনে। আন্দোলনের কিঞ্চিৎ অর্জন মূলত ধরা ছোয়ার বাইরে। নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে ভাষা-সংস্কৃতির চর্চা ও সংরক্ষনের বিকল্প নেই। সম্প্রতি এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষনে জেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতি সংরক্ষণে সরকারের পাশাপাশি এই সব জনগোষ্ঠীর লোকজনদেরকেই দায় নিতে হবে। নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষনে নিজেরা তৎপর না হলে অন্যরা কেউ এসে সেটা করে দিয়ে যাবে না নিশ্চয়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নিজেদেরকে উৎসাহী, উদ্যোগী হয়ে ভাষা, সংস্কৃতি সংরক্ষনে ভ’মিকা রাখতে হবে। নতুবা আখেরে লাভ সরকারেরই হবে, আন্দোলনের ফল শূণ্য হবে। কেননা, আদিবাসী আন্দোলনের মূল স্তম্ভগুলোর মধ্যে ভাষা, কৃষ্টি-কালচার চর্চা ও সংরক্ষণ অন্যতম। নানা অসুবিধায় নিজেদের ভাষায় বই বের করা যাচ্ছে না। আদিবাসীদের নিজেদের ভাষায় বই বের করে সঠিক ইতিহাসগুলো পাঠ্যপুস্তুকে সংযোজন করা দরকার।
এছাড়া, নানা কারনে এখনও সক্রিয় রাজনীতিতে আসতে পারেনি এই সব মানুষগুলো। শক্তিশালী সঠিক নের্তৃত্বের অভাবে ধুকে ধুকে মরছে রাজনৈতিক চেতনাহীন এই মানুষেরা। দীর্ঘকাল রাজনীতির বাইরে থাকায় রাজনৈতিক অনেক সুযোগ-সুবিধার বাইরেই থেকে যান তারা।
সর্বোপরি, বর্তমান সরকার দেশের পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠীদের জীবনমান উন্নয়নে বেশ কিছু মৌলিক কাযক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু সে পদক্ষেপ গুলো যাতে আরো বেশি কার্যকরী, ফলপ্রসু হয় সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরী। সরকারি প্রকল্পগুলো বরাদ্ধের পরিমাণ বাড়নোর পাশাপাশি সঠিক তদারিক জরুরী। কাউকে পেছনে ফেলে কোন সত্যিকারের উন্নয়ন হতে পারেনা। সরকারের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা সফল করতে গেলে এই সব পিছিয়ে পড়াদের দূর্বার গতিতে এগিয়ে নিতে হবে। নইলে সত্যিকারের এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়।

লেখক-সাংবাদিক ও আদিবাসী নেতা।

 

নিউজটি শেয়ার করুন


এ জাতীয় আরো খবর..